New Muslims APP

রমযান দান খয়রাতের মাস

রমযান দান খয়রাতের মাস
রমযান দান খয়রাতের মাস
রমযান দান খয়রাতের মাস

রমযান দান খয়রাতের মাস

রমযান মাস শ্রেষ্ঠ মাস, সুতরাং এ মাসে যে কোন ভালো কাজ করলে তার প্রতিদানও বেশি পাওয়া যাবে এটাই স্বাভাবিক। তাই এই পবিত্র মাসে, বরকতের মাসে, দান খয়রাত করলে আশা করা যায় অধিক সাওয়াব লাভ হবে।

সম্মানিত পাঠকবন্ধুগণ! আজকের বিষয়: রমযান মাসে দান করার ফযীলত

এই মর্মে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এরশাদ করছেন:

مَثَلُ الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنْبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنْبُلَةٍ مِائَةُ حَبَّةٍ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ  الَّذِينَ يُنْفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ ثُمَّ لَا يُتْبِعُونَ مَا أَنْفَقُوا مَنًّا وَلَا أَذًى لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ البقرة 261 262

যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি বীজের মত, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়। প্রত্যেকটি শীষে একশ করে দানা থাকে। আল্লাহ অতি দানশীল, সর্বজ্ঞ।

যারা স্বীয় ধন সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, আর  ব্যয় করার পর সে অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে না এবং কষ্টও দেয় না, তাদেরই জন্যে তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে পুরস্কার এবং তাদের কোন আশংকা নেই, তারা চিন্তিতও হবে না। (সূরা বাকারা: (২৬১- ২৬২)

এই দান যদি কেউ রমযান মাসে করে তাহলে তার বিনিময় আরো বৃদ্ধি পাবে। কেননা আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন: إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُ‌ونَ أَجْرَ‌هُم بِغَيْرِ‌ حِسَابٍ   যারা সবরকারী, তারাই তাদের পুরস্কার পায় অগণিত। আর  রমযান মাস সবরের মাস। তাই এই কথা জোর দিয়ে বলা যায় যে, রমযান মাসে দান করলে অবশ্যই সাওয়াব বেশি হবে।

আর রাসূল (রা.) এই মাসে বেশি বেশি দান করতেন:

أَنَّ ابْنَ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُما ، قَالَ :  كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجْوَدَ النَّاسِ بِالْخَيْرِ ، وَكَانَ أَجْوَدُ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ حِينَ يَلْقَاهُ جِبْرِيلُ، وَكَانَ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَام يَلْقَاهُ كُلَّ لَيْلَةٍ فِي رَمَضَانَ ، حَتَّى يَنْسَلِخَ يَعْرِضُ عَلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْقُرْآنَ ، فَإِذَا لَقِيَهُ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلَام ، كَانَ أَجْوَدَ بِالْخَيْرِ مِنَ الرِّيحِ الْمُرْسَلَةِ

মূসা ইবনে ইসমাঈল (রহ.) ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলে করীম (সা.) ধন-সম্পদ ব্যয় করার ব্যাপারে সকলের চেয়ে দানশীল ছিলেন। রমযানে জিবরাঈল আ. যখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতেন, তখন তিনি আরো অধিক দান করতেন। রমযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি রাতেই জিবরাঈল তাঁর সঙ্গে একবার সাক্ষাত করতেন। আর নবী করীম (সা.) তাকে কুরআন শোনাতেন। জিবরাঈল (আ.) যখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতেন তখন তিনি রহমতসহ প্রেরিত বায়ুর চেয়ে অধিক ধন-সম্পদ দান করতেন। (মুসলিম: হাদীস নং ২৩০৮)

রমযানের দান খয়রাত করা আল্লাহর কাছে খুব প্রিয়: বঞ্চিতদের দিকে হাত বাড়ালে আল্লাহ তায়ালাও আপনার দিকে রহমতের হাত বাড়িয়ে দেবেন; এটা আল্লাহ তায়ালার প্রতিশ্রুতি। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে,

وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِّلسَّائِلِ وَالْمَحْرُ‌ومِ 

 “আর তাদের (ধনীদের) অর্থ-সম্পদে ভিক্ষুক ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে”। (সূরা আল-জারিআত, আয়াত ১৯)

গরিবদের দান-খয়রাত করা কোনো করুণার ব্যাপার নয়; বরং দান হলো নিজের আমলনামাকে সমৃদ্ধ করার সর্বোত্তম উপায়। মনে রাখতে হবে গরিবদের সম্পদহীন করে আল্লাহ যেমন তাদের পরীক্ষা করেন, তেমনি ধনীদেরও ধন-সম্পদ দিয়ে আল্লাহ পরীক্ষা করেন।

দান সদকা গুনাহ মিটিয়ে দেয়:

রাসূল (সা.) বলেন:

وَالصَّدَقَةُ تُطْفِئُ الْخَطِيئَةَ كَمَا يُطْفِئُ الْمَاءُ النَّارَ

 দান-ছাদকা গুনাহ মিটিয়ে ফেলে যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে ফেলে। (সহীহুল জামে/৫১৩৬)

খালেস নিয়তে, দায়িত্ব মনে করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে যদি দান করা হয়, তাহলে তার ব্যাপক ফযীলত রয়েছে। এসব ফযীলতের কিছুটা পার্থিব এই পৃথিবীতেও লক্ষ্য করা যায়, তবে বেশিরভাগ ফযীলতই পরবর্তী জীবনের পাথেয় হিসেবে জমা থাকে। এছাড়াও এ জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারও পাবেন দানকারীরা। এ কারণেই দয়াময় আল্লাহ কুরআনে কারিমে দান-খয়রাতের ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছেন এবং সেই সঙ্গে দানের ব্যাপারে নিয়তের স্বচ্ছতার কথা বলেছেন।

দান করার কিছু নীতিমালা আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কারিমে ঘোষণা করেছেন। যেমন, দান করতে হবে শুধু আল্লাহ তায়ালার জন্য। কাউকে দেখানোর জন্য নয়। দান-খয়রাত করে ভবিষ্যতে কোনো স্বার্থ হাসিলের নিয়ত করা যাবে না। আত্মপ্রদর্শনের উদ্দেশ্য কৃত দানকে নিকৃষ্টতম দান বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে ইসলামে। এছাড়া যাকে দান করা হলো তার কাছ থেকে এর বিনিময়ে কোনো সুযোগ-সুবিধাও গ্রহণ করা যাবে না।

 কোনো প্রকার অপচয় না করে রোযার মাসে মানুষের সেবায় দান-সাদকা করলে অভাবক্লিষ্ট মানুষের কল্যাণ হয় এবং মানবতা উপকৃত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) সমগ্র মানবকুলের মধ্যে সর্বাধিক উদার ও দানশীল ছিলেন। রমযান মাসে যখন হজরত জিব্রাইল (আ.) নিয়মিত আসতে শুরু করতেন, তখন তাঁর দানশীলতা বহুগুণ বেড়ে যেত। (বুখারি)

হযরত আনাস (রা.) বলেছেন, আমি নবী করিম (সা.)-এর চেয়ে কাউকে অধিকতর দয়ালু দেখিনি। (মুসলিম) সিয়াম সাধনার মাধ্যমে রোযাদারের অন্তরে দানশীলতা ও বদান্যতার গুণাবলি সৃষ্টি হতে পারে। রাসুল (সঃ) বলেছেন দান হচ্ছে দলীল। দলীল দ্বারা যেমন জমি দখল করা যায় তেমনি দান দিয়ে জান্নাত দখল করা যায়।

 আর ইসলামের ইতিহাসের শুরু থেকেই দাওয়াতী কাজকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ইসলামের হেফাজতের জন্য আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন দেখা দিয়ে আসছে। এই জন্য স্বয়ং রাসুল (সঃ) তাবুকের যুদ্ধের জন্য সাহাবীদের কাছ থেকে দান নিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন সময় রাসুল (সঃ) সাহাবিদেরকে দান করতে উৎসাহিত করেছেন। এমনকি খেজুরের এক টুকরা দান করে হলেও জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেকে বাঁচাতে বলেছেন। ধন-সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ তাআলা। তিনি যাকে ইচ্ছা উহা প্রদান করে থাকেন। এজন্য এ সম্পদ অর্জন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে তাঁর বিধি-নিষেধ মেনে চলা আবশ্যক। সৎ পন্থায় সম্পদ উপার্জন ও সৎ পথে উহা ব্যয় করা হলেই তার হিসাব প্রদান করা সহজ হবে।

 কিয়ামতের দিন যে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কোন মানুষ সামনে যেতে পারবে না, তন্মধ্যে দুটি প্রশ্নই ধন-সম্পদ বিষয়ক। প্রশ্ন করা হবে, কোন পথে সম্পদ উপার্জন করেছ এবং কোন পথে উহা ব্যয় করেছ।

দানে ধন কমে না:

অধিকাংশ মানুষ দান-খয়রাত করতে চায় না। মনে করে এতে সম্পদ কমে যাবে। তাই সম্পদ সঞ্চিত করে রাখতেই সর্বদা সচেষ্ট থাকে, এমনকি নিজের প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রেও খরচ করতে কৃপণতা করে। প্রকৃত পক্ষে দান-ছাদকা করলে সম্পদ কমে না। আবু কাবশা আল আনমারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা.)কে বলতে শুনেছেনঃ مَا نَقَصَ مَالُ عَبْدٍ مِنْ صَدَقَةٍ  ছাদকা করলে কোন মানুষের সম্পদ কমে না। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)

 বরং দান সম্পদকে বৃদ্ধি করেঃ পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন

مَثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنْبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنْبُلَةٍ مِائَةُ حَبَّةٍ وَاللهُ يُضَاعِفُ لِمَنْ يَشَاءُ وَاللهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ

যারা আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয় করে তার উদাহরণ হচ্ছে সেই বীজের মত যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়। আর প্রতিটি শীষে একশতটি করে দানা থাকে। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অতিরিক্ত দান করেন। আল্লাহ সুপ্রশস্ত সুবিজ্ঞ। (সূরা বাকারা-২৬১) সন্দেহ নেই ধন-সম্পদ নিজের আরাম-আয়েশ এবং পরিবারের ভরণ-পোষণের ক্ষেত্রে ব্যয় করার অনুমতি ইসলামে আছে এবং অনাগত সন্তানদের জন্য সঞ্চিত করে রাখাও পাপের কিছু নয়। কিন্তু পাপ ও অন্যায় হচ্ছে, সম্পদে গরীব-দুঃখীর হক আদায় না করা। অভাবী মানুষের দুঃখ দূর করার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করা। অথচ আল্লাহ বলেনঃ وَالَّذِينَ فِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ مَعْلُومٌ، لِلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ এবং তাদের সম্পদে নির্দিষ্ট হক রয়েছে। ভিক্ষুক এবং বঞ্চিত (অভাবী অথচ লজ্জায় কারো কাছে হাত পাতে না) সকলের হক রয়েছে। (মাআরেজ- ২৪-২৫)

রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেনঃ মানুষ বলে আমার সম্পদ! আমার সম্পদ!! অথচ তিনটি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সম্পদই শুধু তার। যা খেয়ে শেষ করেছে, যা পরিধান করে নষ্ট করেছে এবং যা দান করে জমা করেছে- তাই শুধু তার। আর অবশিষ্ট সম্পদ সে ছেড়ে যাবে, মানুষ তা নিয়ে যাবে। (মুসলিম)

দান খয়রাত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেনঃ مَنْ أَنْفَقَ نَفَقَةً فِي سَبِيلِ اللهِ كَانَتْ لَهُ بِسَبْعِ مِائَةِ ضِعْفٍ যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে কোন কিছু ব্যয় করবে তাকে সাতশত গুণ ছওয়াব প্রদান করা হবে।(আহমাদ, সনদ ছহীহ)

 রাসূলুল্লাহ্ (সা.) আরও বলেনঃ যে ব্যক্তি নিজের হালাল কামাই থেকে- (আল্লাহ হালাল কামাই ছাড়া দান কবুল করেন না-) একটি খেজুর ছাদকা করে, আল্লাহ উহা ডান হাতে কবুল করেন অতঃপর তা বৃদ্ধি করতে থাকেন- যেমন তোমরা ঘোড়ার বাচ্চাকে প্রতিপালন করে থাক- এমনকি উহা একটি পাহাড় পরিমাণ হয়ে যায়।” (বুখারী ও মুসলিম)

মাহে রমযানে দানের ফযীলত অনেক বেশি। অন্য ১১ মাসের তুলনায় এ মাসে অধিক দান-সাদকা করা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর উম্মতদের বাস্তব শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে রমযান মাসে দান-দক্ষিণা ও বদান্যতার হাত বেশি করে প্রসারিত করতেন। মাহে রমযানে তাঁর দানশীলতা অন্যান্য মাসের তুলনায় বৃদ্ধি পেত। এ মাসটিকে তিনি দানশীলতার ব্যাপারে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাস হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাই রমযানের এখনো যে কটা দিন সময় আছে, সুযোগ আছে দায়িত্ব পালন করার, দান-খয়রাত করার, গরিব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়ানোর, এতিম-মিসকিনদের দিকে দুহাত বাড়িয়ে দেয়ার, তাদের তা করার সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়।

মহান আল্লাহ এই রমযান মাসে আমাদের সাধ্যমতো দান খয়রাত করে তার পূর্ণ ফযীলত লাভের তৌফিক দান করে । আমিন

1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (2 votes, average: 4.00 out of 5)
Loading...

One thought on “রমযান দান খয়রাতের মাস

Leave a Reply


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.